সকল শিরোনাম

সিদ্ধিরগঞ্জের শিমরাইল এলাকায় র‌্যাব-১১ এর অভিযানে ০৪ পরিবহন চাঁদাবাজ গ্রেফতার রূপগঞ্জে পুলিশ পরিদর্শকসহ ব্যবসায়ীকে হানজালা বাহিনীর হুমকি, ইটপাটকেল নিক্ষেপে দুই পুলিশ সদস্য আহত রূপগঞ্জে মন্ত্রীর পক্ষে ছাত্রলীগ নেতারদের বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হলেন আহমদে জামাল ঢাকায় বিয়ে উৎসব, অংশ নেবেন কারা? ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই দেশে ভ্যাকসিন প্রয়োগ শুরু গোটা বিশ্বই ধ্বংস হবে মশা মারার ওষুধ কতটা কার্যকর? সশস্ত্র বিক্ষোভের শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সতর্কতা বিটিএমসিতে অনিয়ম ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে দল ঘোষণা আমাকে বিয়ে করবে? শ্রীলেখা ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদ ২০ শতাংশ নির্ধারণ ১১৬৮ নমুনায় ৮৮ আক্রান্ত করোনা কেড়ে নিল আরও ২১ প্রাণ বার্সেলোনার সভাপতি নির্বাচন স্থগিত ভোটে সক্রিয় ছিল না বিএনপি টাকা যাঁর, টিকা তাঁর এমন যেন না হয়… ওবায়দুল কাদেরের ভাই কাদের মির্জা জয়ী মানুষের দারিদ্র্যের অন্যতম কারণ উপার্জনে সুযোগের সীমাবদ্ধতা আমদানি বৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে স্বস্তির ইঙ্গিত তৈরি পোশাকের ক্রেতাদের এগিয়ে আসার আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর স্বামীর প্ররোচনায় স্ত্রীর আত্মহত্যা করোনা ভ্যাকসিন জানুয়ারিতেই পাব ॥ স্বাস্থ্যমন্ত্রী হোটেলে আটকে রেখে তরুণীকে ২ বন্ধুর পালাক্রমে ধর্ষণ

বিদ্যানন্দের পাশেই থাকুন

| ২৫ বৈশাখ ১৪২৭ | Friday, May 8, 2020

প্রভাষ আমিন : আগেও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নাম শুনেছি। তাদের ‘এক টাকার আহার’ নামে একটি প্রকল্প বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। অনলাইনে-অফলাইনে নানাভাবে নামটা কানে এলেও তেমন জানা হয়নি। তবে এবারের করোনা বিপর্যয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানি এই বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনকেই। ‘আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন’ এই লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ২০১৬ সালে গঠিত এই ফাউন্ডেশন শুরুতে পথশিশুদের পড়াশোনা করাত। এই পথশিশুদের জন্যই তারা চালু করেছিল ‘এক টাকার আহার’ কর্মসূচি। খেতে হলে এক টাকা লাগবে। কেউ হয়তো ভাবতে পারেন, পথশিশুদের খেতে হলে এক টাকা লাগবে কেন। চাইলে তো এক টাকা না নিয়েও খাওয়াতে পারত। আসলেই পারত। এক টাকাটা আসলে বিষয় নয়। বিষয় হলো মানুষের মর্যাদা। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন পথশিশুদের ভিক্ষুক বানাতে চায়নি। শিক্ষিত করে মর্যাদাবান মানুষ বানাতে চেয়েছে। এখানেই অনন্য বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এটি মূলত স্কুল। তাদের ফেসবুক পেজে তা-ই লেখা আছে।

তাদের স্লোগান ‘পড়বো, খেলবো, শিখবো’। তবে পথশিশুদের অন্ন এবং শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যানন্দ আরো অনেক কাজ করেছে। পাঁচ টাকায় দরিদ্র নারীদের জন্য স্যানিটারি প্যাড সরবরাহ যার একটি। তাদের ভাবনাগুলোই আসলে অভিনব। তবে এতদিন যাই করুক না কেন, করোনা দুর্যোগ শুরুর পর অন্য এক বিদ্যানন্দেও দেখা পায় বাংলাদেশ। তাই বলছি, মানছি; এই করোনাকালে বাংলাদেশের সেরা প্রাপ্তি বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। অতি অল্প সময়ে সংগঠনটি সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেছে। করোনা দুর্যোগে দুটি বিষয় ছিল, একটি স্বাস্থ্য ঝুঁকি, আরেকটা হলো ঘরে আটকে পড়া মানুষদের খাবার নিশ্চিত করা। অন্য সব দুর্যোগের মতো এবার সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ত্রাণ বিতরণের সুযোগ এবার নেই। সামাজিক দূরত্বই যেখানে মূল নিদান, সেখানে চাইলেই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। সেখানে এগিয়ে এসেছে এই বিদ্যানন্দ। তাদের নির্ভিক স্বেচ্ছাসেবীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দিচ্ছে প্রয়োজনীয় সামগ্রী। শুরুতে তারা জীবাণুনাশক ছিটিয়েছে। এখন পৌঁছে দিচ্ছে খাবার। আর অন্য অনেক সংগঠনের মতো তাদের ত্রাণ বিতরণ ফটোসেশনের নয়, প্রয়োজনের। সবাই যেখানে ত্রাণ দেয়ার জন্য সহজ লক্ষ্য খুঁজে নেয়, বিদ্যানন্দ সেখানেই আলাদা। তারা দুর্গম পাহাড়, দুর্গমতম উপক‚ল, ভাসমান বেদে এ ধরনের মানুষ; যাদের কাছে কেউ কখনো ত্রাণ নিয়ে যায়নি বা যাওয়ার কথা ভাবেনি। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। এখানে ত্রাণ নিয়ে নানা রকমের উদ্যোগ দেখেছি, শুনেছি। কিন্তু বিদ্যানন্দের ভাবনাটা সত্যি অন্যরকম তারা ত্রাণ দেয়, কিন্তু তাতে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না। কারণ তারা ছবি তোলে না। তারা কাউকেই ভিক্ষুক মনে করে না।
দেশজুড়ে লকডাউনের মধ্যে কৃষকরা যখন উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিপাকে, তখন বিদ্যানন্দ তাদের পাশে দাঁড়ায়। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে কিনে খোলাবাজারে রেখে দেয়। বিদ্যানন্দের খোলাবাজার সত্যিই খোলা। রাস্তার মোড়ে তারা সবজি স্ত‚প করে রেখে দেয়। যার দরকার সে তুলে নেবে। এই দানছত্র খোলার জন্য বিদ্যানন্দ টাকা পায় কই? তাদের টাকা দেন আপনি। সত্যি আপনার মতো দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষের দানের টাকায় চলে বিদ্যানন্দ। বিদ্যানন্দকে এক টাকা থেকে কোটি টাকা দান করেছেন অনেকে। যারা দান করছেন, তারাও নাম চাইছেন না। আবার যারা ত্রাণ দিচ্ছে, তারাও প্রচার চাইছেন না। এ এক অদ্ভুত উদ্যোগ। এই দুর্যোগে যারা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান কিন্তু ছোট্ট সামর্থ্য; তারা তাদের দান তুলে দিচ্ছেন বিদ্যানন্দের হাতে।
এতদিন ত্রাণের কথা শুনলেই মনে আসত ত্রাণ চুরির কথা। এবারো ত্রাণের চাল চুরির অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বিদ্যানন্দ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে স্বচ্ছতার সঙ্গে। মানুষ এবার বিদ্যানন্দকেই আঁকড়ে ধরেছে। তাই নিজেদের সামর্থ্যটুকু নিশ্চিন্তে তুলে দিচ্ছে তাদের হাতে। বিদ্যানন্দ কী করছে, তার বিবরণ দিতে গেলে আলাদা লেখা লাগবে। খালি একটা কথা এই করোনাকালে তারা কয়েক কোটি টাকার পণ্য বিলি করেছে, কোনো সন্দেহ ছাড়া, স্বচ্ছতার সঙ্গে।
২০১৬ সালে চালু হওয়া সংগঠনটি ‘এক টাকার আহার’ দিয়ে পরিচিতি পেয়েছিল বটে, তবে এবার তাদের কাজ সুনজর কেড়েছে অনেকের, সঙ্গে কুনজরও কেড়েছে কিছু ধর্মান্ধের। নাম দিয়ে যারা ধর্ম বিচার করে, ধর্ম দিয়ে যারা মানুষ বিচার করে সেই ধর্মান্ধদের আপত্তি ‘বিদ্যানন্দ’ নাম নিয়ে। তাদের ধারণা কোনো হিন্দু ব্যক্তির নাম থেকে ‘বিদ্যানন্দ’ এসেছে। বিদ্যানন্দ তাদের ফেসবুক পেজে ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছে, ‘আনন্দের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জন’ স্লোগান থেকে এক মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট নামটি দিয়েছিলেন। তার মানে ‘বিদ্যানন্দ’ নামের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। মৌলবাদীদের আক্রমণে সংগঠনটি তাদের নামও বদলাতে চেয়েছিল, কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকরা রাজি না থাকায় সেটি হয়নি। তাদের ফেসবুক পেজে আরো দাবি করা হয়, ৯০ ভাগ মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকই চালিয়ে যান সংগঠনটির বিশাল কর্মযজ্ঞ। এই পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের নাম যে কিশোর কুমার দাস। এবার তো আর কোনো যুক্তি নেই। তাই মৌলবাদীদের আক্রমণ থেকে বিদ্যানন্দকে বাঁচাতে পদই ত্যাগ করেন কিশোর। মা যেমন সন্তানকে বাঁচাতে দাবি ছেড়ে দেয়, কিশোরও তেমনি বিদ্যানন্দকে বাঁচাতে দূরে সরে যেতে চান। যদিও তার পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়নি।
কিন্তু যে স্টাইলে বিদ্যানন্দ আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে, তা আমার ভালো লাগেনি। আমি ধরে নিচ্ছি, বিদ্যানন্দ নামটি কোনো স্লোগান থেকে আসেনি, কোনো মুসলিম ব্র্যান্ড এক্সপার্ট দেননি, কোনো হিন্দু ব্যক্তির নাম থেকেই এসেছে। তাতে সমস্যা কোথায়? আমি ধরে নিচ্ছি, স্বেচ্ছাসেবকদের ৯০ ভাগ মুসলমান নয়; বৌদ্ধ, হিন্দু বা খ্রিস্টান; তাতে সমস্যা কোথায়? বিদ্যানন্দের চেয়ারম্যান কিশোর কুমার দাস নাকি মাইকেল কিশোর নাকি কিশোর বড়ুয়া না কিশোর ইসলাম তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তার নাম বা ধর্ম দিয়ে বিবেচনা করি না; করি শুধু কর্ম দিয়ে। এই করোনার দুঃসময়ে বিদ্যানন্দ আমার যতটা ভালোবাসা পেয়েছে, আল মারকাজুলও ততটাই পেয়েছে।
নিশ্চয়ই কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তি বিদ্যানন্দের নাম নিয়ে, উদ্যোক্তার ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করেছে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। আর চালাচ্ছে বলেই তারা তাদের পেজে ব্যাখ্যা দিয়েছে, উদ্যোক্তার পদত্যাগের খবর দিয়েছে। এটা যেমন সত্যি, আবার এটাও তো সত্যি লাখো মুসলমানের দানেই চলছে বিদ্যানন্দের কার্যক্রম। তাই অল্পকিছু ধর্মান্ধ মুসলমানের অবিমৃষ্যকারিতায় যেন ইসলাম ধর্মকেই খাটো করা না হয়, সেটা মাথায় রাখতে হবে। কিশোর কুমার দাসের পদত্যাগের ঘোষণা আসার পর এ নিয়ে তীব্র আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাতে তিনি দাবি করেছেন, তিনি আমি বিদ্যানন্দ ছাড়ছেন না, পরিচালনা পর্ষদেই থাকছেন। শুধু দায়িত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছিলেন, তবে পরিচালনা পর্ষদ সে আবেদন গ্রহণ করেনি। কিশোর দাবি করেছেন, তার এই সিদ্ধান্ত কোনো চাপে নয়; শারীরিক ক্লান্তি এবং ব্যক্তিগত আবেগের কাছে হার মেনেই এই সিদ্ধান্ত। কিশোর আরো জানিয়েছেন, সব ধর্মের মানুষের সহযোগিতায়ই বিদ্যানন্দের এতদূর আসা। কিছু মন্দ লোকের অপপ্রচার সেখানে খুবই নগণ্য। কিশোরকে ধন্যবাদ এই ব্যাখ্যার জন্য। লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো মানে হয় না। লড়াইয়ে অনেক বাধা আসবে। বাধা অতিক্রম করেই এগিয়ে যেতে হবে।
বিদ্যানন্দের বন্ধুদের বলছি, আপনারা নগণ্যসংখ্যক ধর্মান্ধ মৌলবাদীর হুমকিতে ভয় পাবেন না, তাদের গালি কানে তুলবেন না। অল্পসংখ্যক ধর্মান্ধের কথা শুনে ইসলাম ধর্মকে বিবেচনা করবেন না। এসব শুনলে আপনাদের মন খারাপ হবে, ফোকাস নষ্ট হবে। কারো কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে না। নিজের বিবেকের কাছে পরিস্কার থেকে আপনারা মন দিয়ে আপনাদের কাজটা করুন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গোটা বাংলাদেশ আপনাদের পাশে আছে, থাকবে।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com