সকল শিরোনাম

বৈশাখ : কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ… বইমেলায় পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে ডা. বদরুল আলমের অদম্য রম্য রচনার বই ‘ এক্স ফাইলস’ উপ-সম্পাদকীয় ইসলামের দৃষ্টিতে ভালবাসা অর্থনীতিতে এগুচ্ছে দেশ; সভ্যতায় কেন পিছিয়ে? নাসর ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা পাকিস্তানের শিগগিরই ছাত্রদলের নতুন কমিটি শুধু জিপিও-৫ নয়, সুনাগরিক হওয়াও জরুরি : শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো হচ্ছে এবার বাড়ল ডালের দাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক ৩ জেলায় ২ কিশোরী ও ১ শিশু ধর্ষণের শিকার মিলল সেন আমলের রাজবাড়ি বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে : প্রধানমন্ত্রী যৌবন ধরে রাখবে যেসব খাবার কোনো নির্বাচনেই অংশ নেবে না বিএনপি: মির্জা ফখরুল ফেসবুককে বিদায়ের কারণ জানালেন ন্যান্সি বিশ্বের শীর্ষ ১০০ চিন্তাবিদদের তালিকায় শেখ হাসিনা হাঁস মুরগি মাছে বিষাক্ত পদার্থ সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা বহাল ৫ কোম্পানির পানি পানের উপযোগী নয়: বিএসটিআই বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ছিল প্রজাতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি ভয়ের সংস্কৃতিতে আড়ষ্ট সমাজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে দেশবাসীর ৩টি চাওয়া দুর্নীতির একি রীতি? নিবার্চন উপলক্ষ্যে র‌্যাবের নিরাপত্তা বলয়ে রূপগঞ্জ


এ পাতার অন্যান্য সংবাদ

বৈশাখ : কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ… ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক কবিরাজি হালুয়া খেয়ে মৃত্যু! বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ছিল প্রজাতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি ভয়ের সংস্কৃতিতে আড়ষ্ট সমাজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে দেশবাসীর ৩টি চাওয়া সুষ্ঠু নির্বাচনে দেশ কি সক্ষম? ২৯ সেপ্টেম্বর কি হবে? পুরুষত্বের পাঠ্যবই : ছাগলের রাজত্ব, ওড়নার শ্রেষ্ঠত্ব ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয় বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী-হেফাজত? পরিবহন খাত নৈরাজ্যমুক্ত করুন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অবহেলার মুখে অর্থনীতি অবহেলিত অর্থনীতিবিদ নারী, তোমার সঙ্গে আড়ি!

কবিরাজি হালুয়া খেয়ে মৃত্যু!

ঊপ-সম্পাদকীয়, ছবি স্লাইড | ১২ মাঘ ১৪২৫ | Friday, January 25, 2019

মুনীরউদ্দিন আহমদ:

 

কবিরাজি চিকিৎসা

কবিরাজি চিকিৎসা। ফাইল ছবি

বেশ কিছুকাল আগে পত্রিকায় গড়েছিলাম, কবিরাজি হালুয়া খেয়ে টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার মোনতলা এলাকায় ৪ যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।

এক পর্যায়ে নিহতদের পরিবারের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে স্থানীয় থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘাতক কবিরাজ পালিয়ে গেছে।

পুলিশ ও এলাকাবাসী জানায়, ৫ যুবক স্থানীয় এক কবিরাজের কাছ থেকে এক ধরনের হালুয়া খায়। রাত ২টার দিকে তাদের বমি শুরু হলে পরিবারের লোকজন মুমূর্ষু অবস্থায় তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার প্রস্তুতি নেয়। হাসপাতালে নেয়ার পথেই একজন মারা যায়। এছাড়া হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায় আরও ৩ জন। কোন কবিরাজের হালুয়া খেয়ে ৪ যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

কিছুদিন আগে এক টেলিভিশন সাংবাদিকের সুবাদে আমি বেশ কিছু আজগুবি হার্বাল ওষুধ হাতে পাই। অজানা-অখ্যাত কোনো কোম্পানি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এসব ওষুধের কার্যকারিতার বহর দেখে আমি হতবাক হয়ে যাই। এসব ওষুধ কোথায়, কীভাবে, কার তত্ত্বাবধানে তৈরি হয়, কীভাবে বাজারজাত হয়, কেউ জানে না। শহরে না হলেও গ্রামগঞ্জে এসব ওষুধের বেশ কাটতি রয়েছে।

এ ধরনের একটি ওষুধের গায়ে লেখা কার্যকারিতার মধ্যে রয়েছে- ‘সাধারণ দুর্বলতা, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, মানসিক উদ্বেগ, স্মরণশক্তির দুর্বলতা, অরুচি, পাকস্থলীর গোলযোগ, অ্যালকোহলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মনোযোগের অভাব, অস্থিরতা ও ভাইরাস সংক্রমণ’। এসব ওষুধের গায়ে কোনো সতর্কবার্তা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ নেই।

এ জাতীয় ওষুধ বা ওষুধ নামধারী বস্তু কতটুকু নিরাপদ বা কার্যকর তা বলা সহজসাধ্য নয়। তবে এসব সেবনে প্রচণ্ড ঝুঁকি আছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব ওষুধের ওপর আমার একটি সাক্ষাৎকার এক টেলিভিশন চ্যানেলে বিস্তৃত আকারে প্রচারিত হয়েছিল।

পেশাগত দিক থেকে আমি একজন ফার্মাসিস্ট বলে ওষুধ ও চিকিৎসা সম্পর্কে আমার আগ্রহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। দেশের নকল, ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ এবং অপচিকিৎসা সম্পর্কে অনেক লেখা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে।

সেই লেখাগুলোতে বাংলাদেশে অপচিকিৎসায় কী মারাত্মক নৈরাজ্য চলছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লেখাগুলোতে বিদ্যমান সমস্যার প্রতিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাও ছিল। কিন্তু লেখাগুলো আমাদের দেশের কোনো কালের কোনো কর্তাব্যক্তি বা নীতিনির্ধারকের দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়নি।

স্মরণাতীতকাল থেকে এ দেশে অপচিকিৎসায় লাখ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, জীবন দিয়েছে অসংখ্য লোক। আমি ব্যক্তিগতভাবে পথে-প্রান্তরে, বাস-ট্রেনে বিক্রি হওয়া ওষুধ নামের এসব ক্ষতিকর পদার্থের ব্যবহার-পরবর্তী ফলাফল ও নিরাপত্তা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছি, ওষুধ নামের এসব জিনিসের অপপ্রয়োগের ফলে বহু মানুষ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের নাম ভাঙিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য অশিক্ষিত ভণ্ড চিকিৎসক। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ নিরীহ মানুষ। শিক্ষিত মানুষ কোনো কালেই এসব চিকিৎসা গ্রহণ করে না। কারণ তাদের বোধ শক্তি আছে। কিন্তু এদেশের লাখ লাখ নিরীহ অসহায় মানুষের সরলতা ও অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত ভণ্ড ও অসৎমানুষ লোক ঠকিয়ে, ক্ষতিসাধন ও হত্যা করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে।

ওষুধ নামের আজগুবি সব বস্তু ও চলমান অপচিকিৎসার হাত থেকে এ দেশের লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে রক্ষা করার জন্য কিছু করণীয় আছে? নাকি জীবন নিয়ে ফ্রিস্টাইলে এসব অপকর্ম চলতেই থাকবে। যদি সত্যি সত্যি কিছু করার থাকে, তবে দেরি না করে এই চলমান অপচিকিৎসা নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার।

ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন সম্পর্কে আমাদের অনেকের মনে একটি সহজ-সরল ধারণা প্রচলিত আছে। ধারণাটি এরকম, ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন নিরাপদ এবং এসব ওষুধের কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। অনেকে বলেন, ভেষজ ওষুধের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সহজলভ্যতা, দামে সস্তা এবং এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। তাই আজ বিশ্বব্যাপী স্লোগান উঠেছে- ফিরে চলো প্রকৃতির কাছে।

ভেষজ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই- এ কথাটি আমার বোধগম্য নয়। আমি বহু বছর ধরে ভেষজ উদ্ভিদ ও ওষুধের ওপর গবেষণা করে আসছি। বিভিন্ন ঔষধি গাছ থেকে প্রায় দু’শ নতুন রাসায়নিক যৌগ আইসোলেট করে অনেক ঔষধি গুণাগুণের ওপর প্রচুর কাজ করেছি।

সুতরাং ঔষধি গাছ এবং হার্বাল ওষুধের ওপর আমার যৎসামান্য অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান আছে বলে আমি জোর দিয়ে বলতে পারি। পৃথিবীতে এমন কোনো ওষুধ নেই যার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। প্রিয় পাঠক আসুন, ভেষজ ওষুধের গুরুত্ব, সীমাবদ্ধতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।

সাম্প্রতিককালে পরিচালিত বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে- হার্বাল ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিষক্রিয়াজনিত রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কিডনি ও লিভার ধ্বংসসহ বিভিন্ন কারণে বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করা ছাড়াও নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হচ্ছে। হার্বাল ওষুধের অন্যতম ভয়াবহ সীমাবদ্ধতা হল, এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান, রাসায়নিক পদার্থ ও কীটনাশকজাতীয় পদার্থ দ্বারা কন্টামিনেশন বা দূষিত হয়ে পড়ে।

ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করে অসংখ্য হার্বাল ওষুধে এসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। বলা হয়ে থাকে, হার্বাল ওষুধের নিজস্ব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার চেয়ে এসব ভয়ংকর পদার্থের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেকগুণ বেশি। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, হার্বাল ওষুধের প্রস্তুতকারকরা এবং তাদের প্রমোটররা এসব তথ্য কোনো সময়ই উল্লেখ করেন না।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে মানুষ বিভিন্ন রোগের প্রতিকারে প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে আসছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উন্নতির পরও মানুষ এখনও সনাতনী চিকিৎসা পদ্ধতি এবং চিকিৎসা উপকরণের ওপর আস্থা হারায়নি, বরং যতই দিন যাচ্ছে মানুষ ও মানবসভ্যতা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মোতাবেক, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার আশি শতাংশ মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ওপর নির্ভর করে। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চত করার লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত আলমা আটা সম্মেলনে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৩০তম অ্যাসেম্বলিতে) ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। ওই সম্মেলনে পৃথিবীর সব দেশের সরকারকে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের বিজ্ঞানসম্মত উন্নয়ন, উৎপাদন, কার্যকর ও নিরাপদ প্রয়োগ নিশ্চতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব প্রদান করা না হলেও পৃথিবীর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উল্লিখিত চিকিৎসা পদ্ধতি ও ওষুধকে স্বীকৃতি প্রদান করায় এক পর্যায়ে বিশ্বজুড়েই ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের আধুনিকীকরণের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

ফলে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, চীন, আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের উৎপাদন স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, গুণগত মান নির্ণয় ও নিরাপদ ব্যবহারের ওপর প্রকৃত অগ্রগতি সাধিত হয়।

পৃথিবীতে ঔষধি গাছগাছড়ার প্রকৃত সংখ্যা কত? এ প্রশ্নের উওর দেয়া খুব সহজ কাজ নয়। কয়েক বছর আগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে ১১টি দেশের বই-পুস্তক ও প্রকাশনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক একুশ হাজার ঔষধি গাছগাছড়ার একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নাপ্রালেট ডাটাবেস তেত্রিশ হাজার গাছগাছড়ার মধ্যে নয় হাজার দুইশ’ গাছগাছড়ার ঔষধি গুণাগুণের কথা লিপিবদ্ধ করে।

এক হিসাব মতে, চীনে পাঁচ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার গাছগাছড়ার ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে ব্যবহৃত অসংখ্য ওষুধের উৎস সরাসরি মেডিসিনাল প্ল্যান্ট অথবা মেডিসিনাল প্ল্যান্ট থেকে প্রাপ্ত উপাদানের রাসায়নিক রূপান্তর ঘটিয়ে ব্যবহার- এ তথ্যটি আমরা অনেকেই জানি না। অ্যালোপ্যাথিতে ব্যবহৃত মরফিন কোডেইন, অ্যাট্রপিন ডিজকসিন, কুইনিন, নসকাপিন, থিউফাইলিন, ভিনব্লাস্টিন, ভিনক্রিস্টিনের মতো অসংখ্য আধুনিক ওষুধ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন গাছগাছড়া থেকে পাওয়া উপাদানে।

১৯৯৩ সালের জুনে ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ‘Contemporary Medicine, Nwe Approaches to Good Practices’ শীর্ষক এক রিপোর্টে হার্বাল মেডিসিনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো তুলে ধরে এবং চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ সাপেক্ষে হার্বাল মেডিসিনের ব্যবহার থেকে যথেষ্ট সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করে। ব্রিটিশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন যুক্তরাজ্যের প্রখ্যাত দু’জন ডারমাটোলজিস্ট এবং চীনের ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন চিকিৎসকদের যৌথ উদ্যোগে চীনের হার্বাল মেডিসিন হিসেবে ডারমাটাইটিসে ব্যবহৃত জেমোফাইট (Zemophyte) নামক একটি ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করে দেখতে পান, হার্বাল ওষুধটি ডারমাটাইটিসে অ্যালোপ্যাথি ওষুধের মতো সম বা ক্ষেত্রবিশেষে বেশি কার্যকারিতা প্রদর্শন করে।

এরই মধ্যে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের মাধ্যমে বহু আধুনিক ওষুধ আবিষ্কার সম্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণটি হচ্ছে ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনহাউজু (Quinhausu)। এ ওষুধটি Artemesia annua থেকে আবিষ্কৃত হয় এবং এ গাছ দুই হাজার বছর ধরে চীনে ম্যালেরিয়া রোগ নিরাময়ে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ওষুধটি বর্তমানে Paluther নামে বহুজাতিক কোম্পানি রোনপোলেঙ্ক কর্তৃক প্রস্তুত ও বাজারজাত হচ্ছে।

অনেকের ধারণা, আগেই যেমন বলেছি, ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন নিরাপদ এবং এসব ওষুধের কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা বিষক্রিয়া নেই। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ ধারণা পাল্টাচ্ছে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যার ক্রমোন্নতির বদৌলতে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন হিসেবে ব্যবহৃত বহু গাছগাছড়া এবং উপকরণের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা প্রকাশিত হচ্ছে। সাইটাস স্কোপেরিয়াস (Cytus Scoparius) গাছ থেকে প্রাপ্ত স্পার্টাইন (Sparteine) নামক এক ওষুধ ডাইইউরেটিক (Diuretic) এবং প্রসবব্যথা উদ্রেককারী হিসেবে যুক্তরাজ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৯৮৯-১৯৯১ সাল পর্যন্ত হংকংয়ে অ্যাকোনাইটিন (Aconitine) বিষক্রিয়ার ২০টি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে।

চীনা ঔষুধি গাছ অ্যাকোনাইটিন-এর শেকড় ব্যথা ও প্রদাহ উপশমে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। শ্রীলঙ্কায় ক্ষতিকর অ্যালকালয়েড (Alkaloid)-এর উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য ৭৫টি ঔষধি গাছগাছড়ার ওপর এক পরীক্ষা চালান হয়। এর মধ্যে অনেক গাছের নির্যাস বা পাউডার লিভার এবং কিডনির ক্ষত সৃষ্টি করতে সক্ষম বলে পরীক্ষায় দেখা গেছে।

আমাদের আশপাশেও বহু গাছগাছড়া রয়েছে যেগুলোর ব্যবহার আপাত দৃষ্টিতে ক্ষতিকর বলে মনে না হলেও দীর্ঘদিন ব্যবহারে এসব গাছগাছড়া সুস্পষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। টকসিকোলজিক্যাল (Toxicological) পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ইউনানি এবং আয়ুর্বেদিতে অসংখ্য গাছগাছড়ার ব্যবহার যুক্তিসঙ্গত কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।

অ্যালোপ্যাথিতে নিরাপত্তা সার্টিফিকেট প্রদান করার আগে প্রত্যেকটি ওষুধ বা উপাদানের টকসিকোলজিক্যাল পরীক্ষা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। আধুনিক ওষুধের প্রত্যেকটি উপাদান এবং আনুষঙ্গিক উপকরণের গুণগত মান নির্ণয় করে ওষুধ উৎপাদনের জন্য পাঠানো হয়। উৎপাদনকালীন ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও উৎপাদন শেষে ওষুধের গুণগত মান নির্ণয় বাধ্যতামূলক। এর পরেও ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে সরকারি পর্যায়ে প্রত্যেকটি ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়।

ইউনানি ও আয়ুর্বেদিকে ১৯৮২ সালের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও এসব ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ওপর প্রকৃত অর্থে নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধান রাখা হয়নি। ইউনানি ও আয়ুর্বেদি ওষুধে ব্যবহৃত সব গাছগাছড়া বা অন্যান্য উপকরণের নাম ও পরিমাণ সব সময় উল্লেখ থাকে না। এসব কারণে এ ওষুধের গুণগত মান নির্ণয়ও সম্ভবপর হয়ে উঠছে না।

ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহের কারণেই হয়তো প্রায়ই আমার মনে কতগুলো প্রশ্ন ভেসে আসে। প্রথমত, ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনে অসংখ্য গাছগাছড়া ও অন্যান্য উপকরণের ব্যবহারের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী? দ্বিতীয়ত, কার্যকারিতার জন্য সব গাছগাছড়া বা উপকরণের উপস্থিতি অপরিহার্য কি না? তৃতীয়, একই ওষুধে অসংখ্য গাছগাছড়া এবং বিভিন্ন উপকরণের উপস্থিতি অপরিহার্য হলেও ব্যবহার কতটুকু নিরাপদ। চতুর্থ, ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনে ব্যবহৃত গাছগাছড়ার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মাত্রা কেমন বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো কী?

এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এবং সমস্যা সমাধানের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রস্তুত স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন ও গুণগত মান নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।

বর্তমানে বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সুবাদে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের উপাদান ও বিভিন্ন উপকরণের গুণগত মান নির্ণয় করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিতরণ ও প্রয়োগ কোনো জটিল ব্যাপার নয়। ইউরোপ, আমেরিকা, ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ বিভিন্ন দেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের উৎপাদন স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, গুণগত মান নির্ণয় ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতকরণে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এসব বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রযুক্তিসহ অন্যান্য সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে প্রস্তুত। ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের গুণগত মান নির্ণয় ভিন্ন একটি কারণেও অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রয়েছে। আমাদের দেশে ঔষধি গাছগাছড়ার কোনো অভাব নেই। অভাব রয়েছে আমাদের চিন্তা-চেতনা ও আগ্রহের। বিভিন্ন রোগের প্রতিকার প্রকৃতিতে লুকায়িত রয়েছে। প্রকৃতির ভাণ্ডার থেকে রোগের প্রতিকার খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদের।

এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিসঙ্গত না হলে তার খেসারত দিতে হবে দেশের নিরীহ কোটি কোটি মানুষকে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে আধুনিকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে এসব ওষুধের কার্যকর ও নিরাপদ ব্যবহার যে শুধু নিশ্চিত হবে তা নয়, ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি দেশের কোটি কোটি মানুষের আস্থা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়