সকল শিরোনাম

ঢাকা-৫ আসন : ডেমরায় জাতীয় পার্টির গণসংযোগ ও কর্মিসভা ৬ দফা দাবি : ডেমরায় রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল শ্রমিকদের জনসভা বদলে যাবে ৩০০ ফুট সড়ক অপরাধী শনাক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে টেকনাফে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত ঐক্যফ্রন্ট প্রস্তুতি নিচ্ছে, নির্বাচনে আসবে: কাদের পঞ্চগড় থেকে দেশের দীর্ঘতম রুটে ট্রেনচলাচল শুরু বাম জোটের নির্বাচন তফসিল প্রত্যাখ্যান সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির সাহসী পদক্ষেপ চাই: বি চৌধুরী খেজুরের ভেতর ইয়াবা! ‘আমার বাড়ি ভোলা, পারলে কিছু কইরেন’ আ’লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ২১ নভেম্বর কোনো অপশক্তি ভর করুক তা কাম্য নয়: নাসিম তাবলিগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রণক্ষেত্র, আহত ১০ দাবি না মানলে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না: রাজশাহীতে ফখরুল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বুঝে পেল বাংলাদেশ শেখ হাসিনার মনোনয়ন ফরম কিনলেন ওবায়দুল কাদের যে বেটারা আমার গাড়ি ঘুরিয়ে দিয়েছে, আমি ওদের মাথা ঘুরিয়ে দেব: কাদের সিদ্দিকী এই তফসিলে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে না সচিব হলেন দুই কর্মকর্তা, ভারপ্রাপ্ত সচিব ৩ জন দুই-একদিনের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন: কাদের নির্বাচনে ৬ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন থাকবে: সিইসি তফসিল ৮ নভেম্বরই বহাল থাকুক: ইসিকে জাতীয় পার্টি টেকনাফে গোলাগুলিতে যুবক নিহত


এ পাতার অন্যান্য সংবাদ

ঢাকা-৫ আসন : ডেমরায় জাতীয় পার্টির গণসংযোগ ও কর্মিসভা ৬ দফা দাবি : ডেমরায় রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল শ্রমিকদের জনসভা বদলে যাবে ৩০০ ফুট সড়ক অপরাধী শনাক্ত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে টেকনাফে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক ব্যবসায়ী নিহত ঐক্যফ্রন্ট প্রস্তুতি নিচ্ছে, নির্বাচনে আসবে: কাদের পঞ্চগড় থেকে দেশের দীর্ঘতম রুটে ট্রেনচলাচল শুরু বাম জোটের নির্বাচন তফসিল প্রত্যাখ্যান সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির সাহসী পদক্ষেপ চাই: বি চৌধুরী খেজুরের ভেতর ইয়াবা! ‘আমার বাড়ি ভোলা, পারলে কিছু কইরেন’ আ’লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী ২১ নভেম্বর কোনো অপশক্তি ভর করুক তা কাম্য নয়: নাসিম তাবলিগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রণক্ষেত্র, আহত ১০

সেবা খাতে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হবে কবে?

সকল শিরোনাম, সম্পাদকের কলাম | ১৭ ভাদ্র ১৪২৫ | Saturday, September 1, 2018

  মীর আব্দুল আলীম : সেদিন পত্রিকায় শিরোনামটা ছিলো এমন “বগল বাজিয়ে ঘুষ-দুর্নীতি!” উদ্ভট শিরোনাম। বগল বাজিয়ে আবার ঘুষ-দুর্নীতি করে নাকি কেউ। আমি বগল বাজিয়ে বলছি এ কারণে, স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে এ দেশে ঘুষ দুর্নীতির ব্যাপ্তিটা এতটাই বেশি বেড়ে গেছে যে, এখন রীতিমত বাদ্য বাজানো হচ্ছে ঘুষ-দুর্নীতির ক্ষেত্রে। গত ৩০ আগষ্ট ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নাগরিক সেবার ১৬টি খাতের তথ্য সংগ্রহ করে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ‘সেবা খাতে দুর্নীতি ঃ জাতীয় খানা জরিপ ২০১৭’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেবা পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়। এদিক থেকে সবার শীর্ষে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দ্বিতীয় ও তৃতীয়তে আছে যথাক্রমে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ। তবে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি ঘুষ নেয় বিআরটিএ। বিভিন্ন ধরনের সেবা পেতে বছরে ঘুষ দিতে হয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশের আইনশৃঙ্খলা সংস্থা,পাসপোর্ট ও বিআরটিএ, ভুমি অফিসে, সাব-রেজিষ্ট্রি অফিস, পুলিশ ষ্টেশন, আদালত পাড়া থেকে শুরু করে সবখানেই অনেকটা রাগঢাকা না রেখে প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণ চলছে। কাজের ব্যপ্তি অনুসারে ঘুষের পরিমানের নির্ধারিত কোন কোন দপ্তরে। সেবা প্রাপ্তি নাগরিক অধিকার। এ অধিকার অনেকটাই হরণ করা হয়েছে।
ঘুষ-দুর্নীতি রেড়েছে তা  কখন বলা চলে? যদি অনেক বেশি লোক ঘুষ নেয়, নাকি যদি অনেক বেশি টাকা ঘুষ দিতে হয়? সংখ্যায় নাকি টাকার অংকে ঘুষের হিসাব? যেদিক দিয়েই হিসাব করি এদেশে ঘুষ-দুর্নীতি কমেনি। অফিস আদালতে ঘুষ দুর্নীতি চলছে। ঘুষের পরিমান অনেক বেড়েছে তা বছরে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। ঘুষ-দুর্নীতি সংখ্যায় কিছুটা কমেছে, টাকার পরিমানে বেড়েছে অনেক। কাজ উদ্ধার করতে রাষ্ট্রের ছোট মাপের নানা কর্তাকে ঘুষ দিতে হয়, তা হলে মনে হয়, দুর্নীতি তো আরও বেড়ে গেল! কিন্তু বড় কর্তা বাবুরা, মন্ত্রী-আমলাদের দফতরে বন্ধ দরজার পিছনে যে সব রফা হয়, সেখানে বহু কোটি টাকার অপচয় কেউ টেরও পায় না। দুর্নীতি বেশি চোখে পড়া মানেই দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া, এমনটা বলা তাই সহজ নয়। এ দেশে মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে, কুচকে-মুচকে ২০-৫০টাকা গ্রহন করে এটা ঘুঘ। আর টেবিলের নিচে, ব্যাংক টু ব্যাংক কোটি কোটি টাকার লেনদেন এটাও অপ্রকাশিত ঘুষ। আমাদের দেশে লোকে ঘুষ দেয় যাতে সুবিধেমতো আইন ভাঙতে পারে। সহজে মানুষ ঘুষ দিতে পারে তাই দেশে আইনও ভঙ্গ হয় বেশি। আবার নেয্য সেবা পেতে জনগনকে ঘুষ দিতে হয়। রাষ্ট্রের জনগনকে সেবা পেতে হয় যদি ঘুষের বিনিময়ে, এর চেয়ে কষ্টের আর কি হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে যেভাবে দুর্নীতির প্রসার ঘটছে তা নি:সন্দেহে উদ্বেগজনক। ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, লুটপাট, জালিয়াতি বেড়েই চলছে। প্রতিদিন নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। দুর্নীতি বাড়ছে। এখনই জনগণের সেবা খাতকে নির্ঝঞ্জাট ও দুর্নীতিমুক্ত রাখা জরুরী হয়ে পরেছে।
দুর্নীতি যে বাড়ছে সাদা চোখেই তা দৃশ্যমান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি কমিয়ে আনার প্রয়াস থেকেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ করেছেন। সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করেছেন। এটা নি:স্বন্দেহে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদইচ্ছা। ঘুষ ও দুর্নীতি কমাতে সচিবদেও বারংবার বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘পে-স্কেলে বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন যেহারে বেড়েছে, তা বিশ্বে বিরল। তাই জনগণ যেন সেবা পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বেতন যেহেতু বেড়েছে তাই ঘুষ-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।’ অথচ সেবা খাতের কোথাও দুর্নীতি কমেছে এমন কথা শোনা যায়নি। বরং ভুক্তভোগীদের মুখে সেবা খাতের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাশাপাশি জোর করে ঘুষ আদায় করার অভিযোগও কমেনি। সেবা খাতের ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন, ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। দুর্নীতির এই চিত্র যে কতোটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তার উদাহরণ উঠে এসেছে টিআইবি’র চলতি প্রতিবেদনে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘুষ ছাড়া সেবা প্রাপ্তি এখন প্রায় দুরূহ।
পৃথিবীর সবদেশেই কম বেশি দুর্নীতি আছে, ঘুষের রেওয়াজ আছে। এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো অজুহাত নেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে, এই দুর্নীতি জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। এই হতাশাবোধের মূল কারণ হচ্ছে যে, দেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যকর ভূমিকা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যত্রুম জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। একটি গণতান্ত্রিক এবং স্বাধীন সমাজ ব্যবস্থার প্রধানতম ভিত্তি হওয়ার কথা এসব প্রতিষ্ঠানের। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অগ্রগণ্য হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, সংবাদ মাধ্যম, সরকারি ও বেসরকারি আমলাতন্ত্র, জাতীয় সংসদ, সরকারি ও বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিখাত। আমরা বিগত কয়েক দশক ধরে এসব প্রতিষ্ঠানকে ক্রমে ধ্বংস বা অকার্যকর করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চালিত করেছি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে যে মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে দুর্নীতি।
ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর প্রতিটি সেক্টরই যেন ছেয়ে গেছে দুর্নীতি ও ঘুষের অভিশাপে। ঘুষ ছাড়া কোন কিছুই মিলেনা। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দেশের ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতের ওপরে জরিপ করে দুর্নীতি ও ঘুষের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির জরিপের তথ্য মতে- ২০১৭ সালে সার্বিকভাবে দেশের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ খানা (পরিবার বা ছোট গোষ্ঠীবিশেষ) দুর্নীতির শিকার হয়েছে। ১৬ সেবাখাতের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থায়, পাসপোর্ট ৬৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বিআরটিএ-তে ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ এবং বিচারিক সেবায় ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। ২০১৭ সালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার প্রশাসন, ভূমি, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা, বিদ্যুৎ, ব্যাংকিং, বিআরটিএ, কর ও শুল্ক, এনজিও, পাসপোর্ট, বীমা, গ্যাস সেবাখাতে এই জরিপ করে টিআইবি। জরিপে বলা হয়, দেশের ৮৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন, ঘুষ না দিলে কোনো সেবা খাতে সেবা মেলে না। জরিপের তথ্য মতে, গত বছর সার্বিকভাবে ঘুষের শিকার (ঘুষ দিতে বাধ্য) হওয়া খানার হার ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঘুষগ্রহণকারী তিনটি খাত হচ্ছে- বিআরটিএ (৬৩ দশমিক ১ শতাংশ), আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা (৬০ দশমিক ৭ শতাংশ) ও পাসপোর্ট সেবা (৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ)। ২০১৭ সালে খানাপ্রতি গড়ে ৫ হাজার ৯৩০ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ঘুষ আদায়কারী খাত হলো- গ্যাস (৩৩ হাজার ৮০৫ টাকা), বিচারিক সেবা (১৬ হাজার ৩১৪ টাকা) ও বিমাখাত (১৪ হাজার ৮৬৫ টাকা)। ২০১৫ সালের তুলনায় এই ঘুষের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে গ্যাস, কৃষি ও বিচারিক খাতে। আর কমেছে শিক্ষা, পাসপোর্ট ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান খাতে। এছাড়া ২০১৫ সালের তুলনায় সেবা খাতে ঘুষের শিকার খানার হার কমলেও ঘুষ আদায়ের পরিমাণ বেড়েছে।
সরকারি কেনাকাটায় কমিশন, ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেয়া, ঠিকাদারের বিল ছাড়ানো, সাব রেজিস্ট্রার, সওজের প্রকৗশলী, বন বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তা, এসিল্যান্ড ও পুলিশের ওসি, এসপিসহ গুরুত্বপূর্ণ যে কোনো বদলির তদবির, জলমহাল বরাদ্দ, সরকারি বাড়ি বিক্রি, আইনগত ফাঁকফোকর দিয়ে সরকারি জমি ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে আসা, প্লট বরাদ্দ ও বরাদ্দ পাওয়া সরকারি প্লট পরিবর্তন করা, প্লটের আকার বাড়ানো এবং নিয়োগ বাণিজ্যে ঘুষ বেড়েছে। উল্লিখিত বিষয়ে সারা বছরই কম বেশি ঘুষ বাণিজ্য চলে। কিন্তু সরকারের শেষ সময়ে এ ধরনের তদবির বেশি করা যায় বলে সচিবালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে এখন তদবিরকারকদের জমজমাট আনাগোনা বিরাজ করছে। আবার এসব কাজকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর পেশাদার তদবিরবাজ চক্রও গড়ে উঠেছে। প্রশাসনে ঘুষ এখন সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণীর পদে লিখিত পরীক্ষা নেয়া বাধ্যতামূলক না হওয়ায় একেবারে তালিকা করে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে লোক নিয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগের অন্ত নেই। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিয়োগ দুর্নীতি প্রমাণ করা যায় না বলে সংশ্লিষ্টরা একেবারে বেপরোয়া। এছাড়া কয়েকজন প্রভাবশালী সচিবের পিএসের দুর্ব্যবহার ও দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্ট সচিবদের ভাবমূর্তি প্রশ্নর মুখে পড়েছে। তাকে নিয়ে রয়েছে দুর্নীতির অনেক মুখরোচক গল্প।
দুর্নীতির এই সর্বগ্রাসী থাবা থেকে কীভাবে মুক্ত হওয়া যায়? এই প্রশ্নর উত্তর দিতে গেলে আমাদের বুঝতে হবে যে কেন দুর্নীতি হয় বা দুর্নীতি বিস্তারের প্রক্রিয়া কীভাবে বৃদ্ধি পায়। সার্বিকভাবে দেখলে দুর্নীতির ব্যাপকতার সাথে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের একটি সম্পর্ক আছে। একথার সত্যতা স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় যে, কেবল মূল্যবোধের অবক্ষয় বাংলাদেশের দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারের প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। বাংলাদেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা জনগণের মনে যে পরিমাণ হতাশার সৃষ্টি করে তা তুলনাহীন। দুর্নীতি কেবল ওপর মহলে হয় তাই নয় বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। এই অংশগ্রহণের কারণ সব ক্ষেত্রেই শুধু লোভ নয় বরং অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে ন্যূনতম জীবন-যাপনের প্রচষ্টা। এই অসহায়ত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া দৃষ্টান্তের, যেখানে দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির সুযোগ নেই বরং জনগণকে মূল্য দিতে হয় সত্ থাকার জন্য। জনগণের কাছে এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেআইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। জনগণের মনে এই ধারণা যত ক্রমবিকাশমান হচ্ছে, হতাশা ততো বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপতা ততো বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এই হতাশার ফল ধরে আমরা হয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর দুর্নীতিতে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ।
বাংলাদেশ একটি প্রধান দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ, এই ধারণাটি সৃষ্টি হয়েছে দেশের আমজনতার মনে, কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ভূমিকা পালনের অবকাশ রাখেনি। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা দেশের জনগণের মনে তীব্র হতাশার সৃষ্টি করেছে, দুর্নীতির পথে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সৃষ্টি করেছে বাধা। যতদিন এই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে না, সমাজে দুর্নীতির ব্যাপক দৌরাত্ম্যের প্রতাপ আমাদের দেখে যেতে হবে। দুর্নীতির যে ধারণা আমরা সৃষ্টি করেছি, সেই ধারণাকে বদলাতে হবে আমাদেরই। আর তা করতে হবে কথাকে কাজে পরিণত করার মাধ্যমে। বাংলা নামের এদেশ আমাদের সবার, তাই আমাদের সবার মিলিত প্রতিরোধে সমাজের সব অনাচার দূর করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও সঠিক ভূমিকা থাকতে হবে। আর এসব বিষয়ে সরকার জনতার ন্যায্য সমর্থন পাবে বলেই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সরকারের সাফল্যের অনেক নজির আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। শত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে গত দুই বছরে মন্ত্রী-এমপি ও তার সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ দুর্নীতির তালিকা কম নয়। ক্রমেই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা সরকারের অর্জনগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে।
সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এ জন্য আমাদের রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা আর দেশের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনেরও কোনো বিকল্প নেই। দুর্নীতি কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সেবা খাতের এই দুর্নীতিই সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে বাধাগ্রস্ত করে তুলছে। আজ দুর্নীতি যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে ছেয়ে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ যার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছে তার পেছনে রয়েছে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া। বেশিরভাগ সময়েই যারা দুর্নীতি করেন তারা পার পেয়ে যান। দুর্নীতির অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমলে নেয়া হয় না, দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি শাস্তি পায় না, ফলে দুর্নীতি রোধ করাও সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতি রোধে আইনের কঠোরতা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি এ জাতীয় অপরাধে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে বিভাগীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রযাজ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী। যা সম্প্রতি টিআইবিরর প্রতিবেদনে সুপারিশ আকারে পেশ করা হয়েছে। টিআইবির অন্যান্য সুপারিশও সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী বলতে হবে। আমরা আশা করব, সরকার সংশ্লিষ্টরা টিআইবি কর্তৃক পরিচালিত জরিপের প্রতি নজর দিবেন এবং সংস্থাটির ১২ দফা সুপারিশমালা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হবেন।
-লেখক- মীর আব্দুল আলীম, সাংবাদিক,  কলামিষ্ট, গবেষক।