সর্বশেষ সংবাদ: বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মানে শিক্ষকদের ভূমিকা শীর্ষক কর্মশালা নির্বাচনী মাঠে একঝাঁক তরুণ মনোনয়নপ্রত্যাশী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়েও উদ্বেগজনক নির্বাচনী প্রচারণায় ঘুম নেই ঢাকা দক্ষিনের প্রার্থীদের ৥ সড়ক দুর্ঘটনা : মায়া কান্নায় কি লাভ? ডেমরায় ট্রাফিকের ঝটিকা অভিযান ও অপরূত কিশোরী উদ্ধার সিসি ক্যামেরার আওতায় রামপুরা ট্রাফিক জোন ঢাকা-৫ আসনে বিএনপি-আ’লীগে একাধিক প্রার্থী, সুবিধাজন অবস্থানে জাপা খালেদাকে জেলে রেখে নির্বাচনের কথা ভাবতে পারে না বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহন না করলে বিএনপি অস্থিত্ব সংকটে পড়বে

সকল শিরোনাম

দু:স্থদের মাঝে বিসিএস পুলিশ পরিবারের ঈদ বস্ত্র বিতরণ ৬ কারণে বিশ্বকাপ জিতবে ব্রাজিল সবার জন্য স্বাস্থ্য প্রধানমন্ত্রীর কানাডা সফর ৬ জুন  দ্রব্যমূল্য বাড়ার মাস কী রমজান! সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে লিখিত স্থগিতাদেশ পেলে গাজীপুর সিটি নির্বাচনের জন্য আপিল করা হবে : অ্যাটর্নি জেনারেল সৌহার্দ্যপূর্ণ আন্তঃবাহিনী সম্পর্ক বজায় রাখার আহবান আইজিপির গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ২৬ জুন বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মানে শিক্ষকদের ভূমিকা শীর্ষক কর্মশালা নির্বাচনী মাঠে একঝাঁক তরুণ মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের নয়, কাজের লোককে ভোট দিন: ওবায়দুল কাদের খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়েও উদ্বেগজনক নির্বাচনী প্রচারণায় ঘুম নেই ঢাকা দক্ষিনের প্রার্থীদের ৥ সড়ক দুর্ঘটনা : মায়া কান্নায় কি লাভ? ডেমরায় ট্রাফিকের ঝটিকা অভিযান ও অপরূত কিশোরী উদ্ধার এমপি হতে শেষ চেষ্টায় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যারাই ক্ষমতায় আসে তারাই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে: ড. কামাল রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫টি খাল খনন করবে ওয়াসা যৌন হয়রানি প্রতিরোধে খসড়া আইনের প্রস্তাব সিসি ক্যামেরার আওতায় রামপুরা ট্রাফিক জোন ঢাকা-৫ আসনে বিএনপি-আ’লীগে একাধিক প্রার্থী, সুবিধাজন অবস্থানে জাপা ফখরুলের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিলেন রিজভী কালবৈশাখীর কারণে রূপালী ব্যা‍ংকের লিখিত পরীক্ষা বাতিল খালেদাকে জেলে রেখে নির্বাচনের কথা ভাবতে পারে না বিএনপি


ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়

ঊপ-সম্পাদকীয়, ছবি স্লাইড, সকল শিরোনাম | ২০ পৌষ ১৪২৪ | Wednesday, January 3, 2018

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতাকে শুধু বাংলাদেশেই অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল তা নয়। পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে একাধিক ধর্মাবলম্বীর সমন্বয়ে জাতিসত্তা গড়ে উঠেছে সে সব দেশের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে ধর্ম নিরপেক্ষতাকে। উদাহরণস্বরূপ তুরস্ক, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার কথা উপস্থাপন করা যেতে পারে। ফিলিস্তিনিদের অবিংসবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বাংলাদেশের অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মধ্যে ধর্র্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করার কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। ভারত-পাকিস্তান অভ্যুদয়ের মতো ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে নয় এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের মুসলমানরাই শুধু অংশগ্রহণ করেনি, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্য ধর্মাবলম্বীরাও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিল। সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সব সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রতি রক্ষা এবং প্রতিটি নাগরিকের তার পছন্দ মতো ধর্মপালনে ন্যায় ও অধিকার নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্যক্তির সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক, বিষয়টি সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক এবং ব্যক্তিগত। কোনো ব্যক্তি বা নাগরিকের ধর্ম পালনে বাধাদানের অধিকার রাষ্ট্রের নেই বরং প্রতিটি নাগরিক যাতে নির্বিঘেœ নিশ্চিন্তে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে তার নিশ্চয়তা দান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য। জাতিসংঘ সনদের ৫৫(ঘ) অনুচ্ছেদ-এ গোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য মানবিক ও মৌলিক অধিকারগুলো সংরক্ষণ ও মর্যাদা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য এবং সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে এ দায়িত্ব এড়াতে পারে না।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, ধর্মের অপব্যবহার, ধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহারের অপকৌশল ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই আমরা লক্ষ্য করে আসছি। পাক-ভারত উপমহাদেশে হিন্দু মুসলমানদের ধর্মীয় বিরোধ সৃষ্টি করে ব্রিটিশ শাসকরা ১৯০ বছর নির্বিঘেœ রাজত্ব করেছে। এ উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান যাতে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে না পারে সেজন্য ব্যবহার করা হয়েছে ধর্মকে। এ বিভেদ সৃষ্টির জন্যই তৈরি করা হয়েছিল ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি’। ব্রিটিশের এ পলিসির শিকার হয়েছিল উপমহাদেশের হিন্দু মুসলমান সবাই। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা রক্তাক্ত করেছিল পাক-ভারত উপমহাদেশের শ্যামল প্রান্তর। যারা এ ভয়াবহ দাঙ্গা প্রত্যক্ষ করেছেন, জীবন সায়াহ্নে বসে রোমন্থন করছেন অতীত স্মৃতি, তাদের চোখের সামনে আজও হয়তোবা ভেসে উঠে কেমন করে সেদিন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের যুপকাষ্ঠে হয়েছিল মানবতার বলিদান। পাকিস্তান শাসনামলের তেইশ বছর ধর্মের অপব্যবহারের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ইসলামের প্রবক্তা সেজে এদেশের মাটিতে অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ আর বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এদেশের মানুষ যখনই কায়েমী স্বার্থের বিরোধিতা করেছে, গণস্বার্থের কথা বলেছে তখনই পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের দোসররা এদেশের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে পবিত্র ধর্মকে। পবিত্র ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনে করেছে অপবিত্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ধর্মের নামে ব্যভিচার, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা, অগ্নি-সংযোগের নামে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের দোসরদের কার্যকলাপ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

ব্রিটিশ শাসনামলের ১৯০ বছর এবং পাকিস্তান শাসনামলের তেইশ বছর রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার এবং এর কুফল বিবেচনায় রেখে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশ সরকার উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ধর্ম অতি পবিত্র, ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে এনে অপবিত্র করা সমীচীন হবে না। তাই সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদে সব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে মর্যাদাদান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার, কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তার ওপর নিপীড়ন বিলোপের ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা।

এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ী যারা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে শোষণ ও বঞ্চনার রাজনীতিতে অভ্যস্থ এবং একশ্রেণির অর্ধশিক্ষিত মোল্লা যারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। তাদের ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা। অথচ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা এমন কোনো তথ্য নেই। বরং পবিত্র ইসলাম ধর্মে পরমতসহিষ্ণুতার কথা বলা আছে, জবরদস্তির কথা নেই। পবিত্র কোরানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘ধর্ম বা জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ নেই।’ পবিত্র কোরানের অনেক আয়াতেই মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জার কাছাকাছি অবস্থান এবং সম্প্রীতি রক্ষা যেন সৃষ্টিকর্তার ধর্মনিরপেক্ষতারই নিদর্শন।

মহানবী (সা.) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের জীবনাদর্শেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামের উদারতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। একবার ধর্মীয় ব্যাপারে মতবিনিময়ের জন্য সিরিয়ার নাজরান থেকে একটি খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল মদিনায় আসেন। সন্ধ্যায় প্রার্থনার জন্য তারা মহানবী (সা) এর কাছে একটু জায়গা চান। সে সময় মুসলমানদের জন্যও মাগরিবের নামাজ পড়ার সময়। অগত্যা মহানবী (সা.) মসজিদের একটি অংশ খ্রিস্টানদের প্রার্থনার জন্য ছেড়ে দেন এবং অপর অংশে তিনি সাহাবীদের নিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। আরো একটি ঘটনার উল্লেখ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা)-এর একজন অমুসলিম ক্রীতদাস ছিল। এটা কিছু সংখ্যক মুসলমানের পছন্দ হচ্ছিল না। তারা খলিফার অগোচরে ক্রীতদাসটিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য পীড়াপীড়ি করলে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়। ক্রীতদাসকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টিকারী দলটি খলিফার নিকট অভিযোগ করেন। খলিফা হযরত ওমর (রা) অভিযোগকারীদের বললেন, ক্রীতদাসটির এরূপ বলার ন্যায়ত অধিকার রয়েছে। পরধর্মের প্রতি সহিষ্ণুতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এর চেয়ে আর কি হতে পারে?

পরমতসহিষ্ণুতার দৃষ্টান্ত পবিত্র ইসলাম ধর্মে যতটা রয়েছে অন্যান্য ধর্মে ততটা পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অথচ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা ইসলামের প্রবক্তা সেজে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন তাদের আসল উদ্দেশ্য পবিত্র ধর্মের চর্চা নয়, বরং এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মকে পুঁজি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা। তার কিছুটা নমুনা পর্যায়ক্রমে উপস্থাপন করা হলো :

স্বাধীনতা লাভের পর তৎকালীন বঙ্গবন্ধু সরকার ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম নীতি হিসেবে গ্রহণ করলেও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনের জন্য ক্ষতিকর বস্তু মদ, জুয়া, হাউজি সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করেছিলেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য নৈতিকতা সম্পর্কে বলা হয়েছে ১. জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষত আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ ও অন্যান্য মাদক পানীয় ও স্বাস্থ্য হানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা করিবেন। ২. গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। মদ, জুয়া, হাউজি সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি সরকার আইন করে মদ, জুয়া ও ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ঘোড় দৌড়ের নামে জুয়া, লটারি, হাউজি প্রভৃতি ধর্ম ও নৈতিকতাবিরোধী কাজগুলো নিষিদ্ধ করেছিলেন। এমনকি সরকারি অনুষ্ঠানাদিতে বিদেশিদেরও মদ পরিবেশন বন্ধ করেছিলেন। পবিত্র ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে গবেষণার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য কাকরাইল এবং টঙ্গীতে তাবলীগ ও বিশ্ব এজতেমার জন্য জায়গা বরাদ্দ, স্বতন্ত্র মাদরাসা বোর্ড স্থাপন সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয়।

’৭৫ এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলের ন্যায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় ধর্মের খেলা। সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, মুছে ফেলা হয়েছে সংবিধানের ১২ নং অনুচ্ছেদ। ইসলামকে ঘোষণা করা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে। পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিকতাবিরোধী মদ, জুয়া, হাউজি অবাধে চালু করা হয়। পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে এই স্ববিরোধিতা প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন এবং দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।

সংবিধানের ৮নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় অন্যতম মূলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা তুলে দিয়ে মূলনীতি হিসাবে বলা হয়েছে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’। এটা আমাদের ধর্মের মূল কথা এবং মুসলমান হিসেবে প্রতিটি মানুষেরই এ বিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমাদের দেশের নাগরিক হিসেবে মুসলমান ব্যতীত অন্যান্য সম্প্রদায়েরও লোক রয়েছে। সংবিধানের ওপর তাদেরও ন্যায়ত অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের মতামত সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমতাবস্থায় এই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ পবিত্র ইসলাম ধর্মে জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই। জবরদস্তি সম্পর্কে পবিত্র কোরানে মহানবীকে (সা) উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন ‘ওরা যা বলে আমি তা জানি, তোমাকে তাদের উপর জবরদস্তি করার জন্য পাঠানো হয়নি, সুতরাং যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কোরআনের সাহায্যে উপদেশ দাও’(৫৩:৫৪)। পবিত্র কোরানে আরো বলা হয়েছে ‘ধর্মে কোন প্রকার জবরদস্তি নেই’(২: ২৫৩)।

সংবিধান পরিবর্তনশীল। জনস্বার্থে প্রতিটি দেশের সংবিধানই নির্ধারিত নিয়মে পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয়ে থাকে। কিন্তু মূলনীতির কোনো পরিবর্তন হয় না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিগত ৫০ বছরে সংবিধানের পরিবর্তন বা সংশোধন দেখতে পাই কিন্তু মূলনীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তেমনি মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রেও একই অবস্থা দেখতে পাই। আধুনিক তুরস্কের জনক মোস্তফা কামাল ১৯২৪ সালে সে দেশের ছ’টি রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নির্ধারণ করেন এবং তারই ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। ১৯৫৮ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর তুরস্কের সংবিধান বাতিল ঘোষণা করা হয়। ১৯৬১ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু আতাতুর্ক মোস্তফা কামালের সময়ে নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় মূলনীতি নতুন সংবিধানে বহাল রাখা হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধন করা হলেও রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিবর্তন করা হয়নি। এমন অবস্থা আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি দেশের সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই একমাত্র ব্যতিক্রম। ব্যক্তিগত এবং দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিকেই মুছে ফেলা হয়েছে।

প্রবন্ধটা শুরু করেছিলাম আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে। কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে সংবিধানের অনেক কথাই এসে গেছে। কারণ ধর্ম নিয়ে রাজাকাররা যেমন ব্যবসা করে তেমনি রাজাকার শ্রেণির ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদরা ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে সংবিধানকে কলুষিত করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। আসলে উভয়ের চরিত্র একই। ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা আর আমাদের দুর্ভাগ্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠী নিরক্ষর এবং ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ। দেশের মানুষের শিক্ষার অনগ্রসরতা এবং ধর্ম পরায়ণতার সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির ধর্মব্যবসায়ী চুটিয়ে ব্যবসা করছে, রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে।
লেখক : গীতিকার, প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক