সকল শিরোনাম

যানজট : গতি নেই; আছে দুর্গতি! ‘ঈদ চাঁদাবাজি’ বন্ধ হউক চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? ক্ষমতাওয়ালাদের পাহাড় : আর লাশগুলো আমাদের! প্রিয়াঙ্কার প্রেমে পড়েছেন ‘দ্য রক’ সবুজ খেলে শরীরে যা বদলে যাবে! ব্যাংকিং খাতে অর্থমন্ত্রীর ‘পাপ কর’! ভোটের দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী ভ্যাটের বাজেট দিয়ে ফেলেছেন : ইশতিয়াক রেজা হেফাজত এখন ‘গলার কাটা’ আ.লীগের, ভেতরে-বাইরে সমালোচনা বাড়ছে! শূকরের মাংসে ভ্যাট তুলে দিলেন অর্থমন্ত্রী: মানুষকে বোকা বানালেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্ধ বৃদ্ধি ভোক্তাদের সঙ্গে প্রহসন : ড. শামসুল লংগদুর ঘটনায় ৪০০ জনকে আসামি করে মামলা বাজেট : সরকার বস্ত্রশিল্পের জন্য ভাবুক ধর্ষকদের সাথে ওদের শাস্তিও যেন হয়? রাজধানীর তৃণমূল গোছাচ্ছে আ.লীগ প্রকল্পে প্রকল্পে সংঘর্ষ! বশ্বকবির ১৫৬ তম জন্মবার্ষিকী আজ ব্যাংকে জমে থাকা ৬১৪ কোটি টাকার লভ্যাংশ উধাও কিভাবে রাজনৈতিক নবজাতক থেকে ফ্রান্সের সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হলেন ম্যাক্রোঁ ফ্রান্সের নতুন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বেওয়ারিশ পরিচয়ে জঙ্গি মারজান ও সাদ্দামের দাফন বজ্রপাতে প্রাণহানি ক্রমেই বাড়ছে আজমপুর ফুটওভার ব্রিজে শ্রমিকদের ভিড় বনশ্রীতে ভাঙা সড়কে জলাবদ্ধতা : দুর্ভোগ মৌসুমি ফলে ভয়াবহ ফরমালিন


অবহেলার মুখে অর্থনীতি অবহেলিত অর্থনীতিবিদ

ঊপ-সম্পাদকীয়, সকল শিরোনাম, সর্বশেষ সংবাদ | ২৭ ফাল্গুন ১৪২৩ | Saturday, March 11, 2017

রবার্ট স্কাইডেলেস্কি |

অবহেলার মুখে অর্থনীতি অবহেলিত অর্থনীতিবিদ
অবহেলার মুখে অর্থনীতি অবহেলিত অর্থনীতিবিদ

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের চিফ ইকোনমিস্ট অ্যান্ডি হ্যালডেন গেল মাসেই বেশ তোপের মুখে পড়েছিলেন। অভিযোগটা হচ্ছে, তিনি নাকি ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক ফোরকাস্ট মডেল নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এ নিয়ে অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে আরো অনেকের আশঙ্কা ছিল। তারা মনে করেছিলেন, গত জুনে ব্রেক্সিটের পর থেকে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে একটা পরিবর্তন আসবে। এ পরিবর্তন অনুষঙ্গে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে না পারলে একটা ছন্দপতন আসন্নই ছিল বলা যায়। কারো মতে, ব্রিটেনের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার যে মূর্খ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বলি হয়েছে তাদের অর্থনীতি। ধীরে ধীরে তাদের আর্থিক ব্যবস্থায় যে অবনমন দেখা যাবে— তার প্রভাব থেকে বাঁচবে না অবকাঠামো, নির্মাণ ও চাকরি খাত। হ্যালডেন শুরু থেকেই বদলে যাওয়া পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন, তবে তিনি সময় মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেননি। এক্ষেত্রে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড একটি বিশেষ মডেল মেনে চলে, যেটা মানতে তিনি বাধ্য ছিলেন। তাই কোনো ধরনের বদল হবে কি হবে না, সে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তাকে অনেকটা নিরুপায় বলাও ভুল হবে না। পুরো পরিস্থিতির জন্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ড কিংবা হ্যালডেন কাউকেই দোষী বলা যায় না। মূলধারার অর্থনীতিবিদরা যে প্রপঞ্চগুলো মেনে চলেন কিংবা যে নীতির ওপর ভিত্তি করে তাদের কাজ এগিয়ে নেন, সমস্যাটা দেখা দিয়েছে সেখানেই। সাধারণ ভাষায় বলতে গেলে সময়ের দাবি মেনে যা করা প্রয়োজন, সেটাই করতে পারেননি হ্যালডেন। তার যোগ্যতা, দক্ষতা আর প্রজ্ঞা নিয়ে কারো দ্বিমত নেই, কিন্তু তিনি যে প্রয়োজন মেনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেননি, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। এক্ষেত্রে নয়া উদারতাবাদী ফোরকাস্টিং মডেলের প্রয়োগ ও ব্যবহার নানা বিতর্কের জন্ম দিতেই পারে। কিন্তু মানুষ তার প্রয়োজন মেনে কোথায় কী সিদ্ধান্ত নেবে বা নিতে চাইবে— সময় হিসাবে সেটাও বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। মানুষ তার পারিপার্শ্বিকতার বিচারে আগে থেকেই ঠিক করে নিতে পারে তার ধর্তব্য-কর্তব্য। শেষ পর্যন্ত তা পূরণ করাই তাদের জন্য এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়। তবে অনেক সময় এর ব্যতিক্রম দেখা যায়, আর সেখানে ব্যাপারটা এমন যে, নতুন বানানো পোশাক কেন তার ক্রেতার গায়ে হচ্ছে না, সেজন্য দর্জি উল্টো দোষ দিচ্ছে ক্রেতাকেই। তবে আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার হচ্ছে, অনেকগুলো অবাস্তব বিষয় সামনে চলে আসা। এতে সবাই নানা উটকো সমস্যা থেকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতে চেষ্টা করছে। অনেক মানুষ সব পারলেও তার স্বভাব বদলাতে পারে না। দীর্ঘদিনের আচারানুষ্ঠানে তিনি যা আয়ত্ত করেছে, সেটাকে হুট করে বাদ দিয়ে নতুন কিছুতে অভ্যস্ত হতেও তাদের সময় লেগে যায় বেশ। এ অবস্থায় পরিস্থিতির দায় মেনে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা কাজ করে বসাটা তাই আপাতদৃষ্টিতে বেশ কঠিন। ব্যাপারটা এমন যে, দোকান খোলা থাকলে মূল্য যা-ই হোক না কেন, কিছু মানুষ সেখানে গিয়ে হাজির হবে। তারা মালপত্র কেনাকাটা না করলেও অন্তত দরকষাকষি করে এক ধরনের উটকো পরস্থিতি সৃষ্টি করবেই। এটা তারা প্রয়োজন থেকে নয়, বরং দীর্ঘ অভ্যাসের দায় নিয়েই করছে এবং ভবিষ্যতেও করে যাবে। তাদের এই আচরণের মতো অর্থনীতির কিছু বিষয় আগে থেকেই অনুমান করে নেয়া যায়। অন্তত পরে কী হবে— এ ব্যাপারটা আগে জেনে নেয়া গেলে মানুষ সতর্ক থাকে। আর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনার প্রভাব নেহাত মন্দ নয়। লন্ডনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের ফোরকাস্ট মডেলের ক্ষেত্রে অনেকটা একই যুক্তি মেনেছে ধরে নেয়া যায়। ব্রেক্সিটের পর কী হবে তারা তা আগে থেকেই অনুমান করেছিল— যা অস্বীকারের উপায় নেই। তাই এখন প্রশ্ন হতে পারে— এই ছন্দপতন অনুমিত থাকার পরেও তারা সঠিক ব্যবস্থা নেয়নি কেন। আর যদি তারা ব্যবস্থা নিয়েই থাকে, তবে আর্থিক খাতের এই ধারাবাহিক অবনমন ও পতন কেন রোধ করা যাচ্ছে না। সবাই নানা যুক্তি দিয়ে ব্রেক্সিট-পরবর্তী আর্থিক ব্যবস্থার ছন্দপতনকে ব্যাখ্যার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে হ্যালডেন এখনো আশাবাদী, তিনি মনে করছেন এ অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু কীভাবে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো যাবে— সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা তিনি দিতে পারেননি। এটা মানতে হবে যে, ব্রেক্সিটের ভোট বড় রকমের কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। এরপর এমন কিছু ঘটনাই ঘটেছে, যা আগে থেকে অনুমিতই ছিল। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ধারাবাহিক বদলও আসেনি— যা পূর্বতন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙেচুরে নতুন করে সাজিয়েছে। তবে প্রথাগত ব্যবস্থার বাইরে থেকে এই নতুন সিদ্ধান্ত অনেক কিছু অন্য রকম করে ভাবতে বাধ্য করছে। এ পরিবর্তনের সূত্র ধরেই যে ছন্দপতন, সেটাকেই একটা বড় রকমের হোঁচট খাওয়া বলে দাবি করছেন কেউ কেউ। আজ বসে থেকে কেউ আগামীকাল কী ঘটবে— সেটা হুবহু বলতে পারেন না, তবে তা নিয়ে অনুমান করতে পারেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ওই অনুমান কতটা কাছাকাছি হবে কিংবা বাস্তবে তার প্রতিফলন কতটা ঘটবে। আর এ ধরনের র্যাডিকেল আনসার্টেনিটি নিয়ে আগে থেকে কেউ মন্তব্য করতে চান না, পরে যখন ঘটনা ঘটে যায় তখন সবাই সরব হয়ে ওঠেন। বলতে গেলে মূল ঝামেলার সূত্রপাত ঘটতে দেখা যায় সেখান থেকেই। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখন ব্রেক্সিট নিয়ে যেসব কথাবার্তা শুরু করেছে, তা নিয়ে আগেও আলোচনা হয়েছে অনেক। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে জটিলতা রয়েছে, যা থেকে উত্তরণ ঘটানো যায়নি এখনো। তবে যা-ই হোক, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়, এর আগেও ঘটেছে। ১৯৪০ সালে জার্মানির কাছে ফ্রান্সের পতনের পর অর্থনীতিবিদ জন মেইনার্ড কেইনস মন্তব্য করেছিলেন। তিনি একজন সংবাদদাতাকে বলেছিলেন, ‘আমার নিজের পক্ষ থেকে যদি কিছু বলার থাকে সেটা হচ্ছে— আমি পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী যে জয় আমাদেরই হবে।’ এর সঙ্গে মেলানো যায় অনেক ব্রিটিশকে, যারা তাদের আর্থিক ভবিষ্যত্ নিয়ে এখনো বেশ আত্মবিশ্বাসী। ব্যস্টিক ও সামষ্টিক ক্ষেত্রে কী ধরনের আর্থিক পরিবর্তন আসবে— তা নিয়ে আগে থেকেই বেশ সতর্ক ছিলেন হ্যালডেন। তবে নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে কিছু ভুল হয়ে গিয়েছিল, যার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন। একটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে থেকে কিছু একটা বলতে হবে বলে সেখানে আশাবাদী মন্তব্যটাই করেছিলেন কেইনস। তিনি ইকোনমিক র্যাশনালিটির ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন। অন্তত র্যাডিকেল আনসার্টেনিটির বিপরীতে তিনি এটাকেই একটু নিরাপদ ভেবেছিলেন বলা যায়। বিশেষ করে যখন কেউ কিছু জানে না, এমনকি কী জানে না সেটাও জানে না, তখন যেমন সমস্যায় পড়ে, কেইনস শুরুর দিকে ওই রকম এক পরিস্থিতি থেকে মন্তব্য করেছিলেন। ফলে তিনি ভবিষ্যত্ নিয়ে যা বলেছেন, সেখানে অতীত অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটাটাই বাস্তব। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ রোমান ফ্রেইডম্যান ও নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল গোল্ডবার্গ তাদের বই ‘বিয়ন্ড মেকানিক্যাল মার্কেট’ গ্রন্থে অনেক চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন। তারা এক্ষেত্রে অনেক মনোজাগতিক বিষয়কে বেশ গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণের প্রয়াস নিয়েছেন। আর সেক্ষেত্রে সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য বিকল্প কিছু চিন্তা করছেন। তাই কেউ কেউ তাদের ‘ইমপারফেক্ট নলেজ ইকোনমিকস’-এর গবেষক বলেও চিহ্নিত করেছেন। তবে তারা শুরুতেই একটা সুচিন্তিত অনুমান করেছেন আর তাই তাদের গবেষণায় শেষ পর্যন্ত সারিন্দা বেজেছে ওই অনুমান নির্ভরতার ওপরই। আর তাদের বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বরাবরই একটা হিস্টোরিক্যাল বেঞ্চমার্ককে মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা গেছে। রাশিয়ার গণিতবিদ ভ্লাদিমির মাশ্চখ ‘রিস্ক কনস্ট্রেইন্ড অপটিমাইজেশন’ নিয়ে একটা স্কিম তৈরি করেছেন। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে দেখা গেছে ‘জোন অব আনসার্টেনিটি’ তথা অনিশ্চিত ব্যাপারগুলোতেই। বরাবরের মতো এখানেও একটা অনুমান করে নিতে দেখা গেছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রভাবিত করেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে। তাই গণিতের ক্ষেত্রে মাশ্চখ যা করেছিলেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে হ্যালডেন ঠিক তেমনটাই করতে গিয়ে অন্তত সফলতার মুখ দেখেননি। কেইনস এমন এক অর্থনীতি চেয়েছিলেন, যা বিচার করে দেখার সক্ষমতা রাখবে। পাশাপাশি সেখানে অর্থনীতি আর গণিতের প্রভাব থাকবে অনেক বেশি। একই সঙ্গে সেখানে নীতিশাস্ত্র, দর্শন, রাজনীতি ও ইতিহাসও গুরুত্ব পাবে সমানভাবে। আর সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনীতিবিদরা সেদিক থেকে পিছিয়ে অনেকটাই গণিত আর কম্পিউটারনির্ভর হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে পুরো বিশ্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়ে ওঠার প্রশ্নে কেইনস বরাবরই সুশিক্ষিত হতে হবে বলে মত দিয়েছেন। [স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট] লেখক: ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ইমেরিটাস ভাষান্তর: সালিম অর্ণব