সকল শিরোনাম

বইমেলায় পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে ডা. বদরুল আলমের অদম্য রম্য রচনার বই ‘ এক্স ফাইলস’ উপ-সম্পাদকীয় ইসলামের দৃষ্টিতে ভালবাসা অর্থনীতিতে এগুচ্ছে দেশ; সভ্যতায় কেন পিছিয়ে? নাসর ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা পাকিস্তানের শিগগিরই ছাত্রদলের নতুন কমিটি শুধু জিপিও-৫ নয়, সুনাগরিক হওয়াও জরুরি : শিক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভালো হচ্ছে এবার বাড়ল ডালের দাম ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক ৩ জেলায় ২ কিশোরী ও ১ শিশু ধর্ষণের শিকার মিলল সেন আমলের রাজবাড়ি বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে হবে : প্রধানমন্ত্রী যৌবন ধরে রাখবে যেসব খাবার কোনো নির্বাচনেই অংশ নেবে না বিএনপি: মির্জা ফখরুল ফেসবুককে বিদায়ের কারণ জানালেন ন্যান্সি বিশ্বের শীর্ষ ১০০ চিন্তাবিদদের তালিকায় শেখ হাসিনা হাঁস মুরগি মাছে বিষাক্ত পদার্থ সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধী কোটা বহাল ৫ কোম্পানির পানি পানের উপযোগী নয়: বিএসটিআই বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ছিল প্রজাতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি ভয়ের সংস্কৃতিতে আড়ষ্ট সমাজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে দেশবাসীর ৩টি চাওয়া দুর্নীতির একি রীতি? নিবার্চন উপলক্ষ্যে র‌্যাবের নিরাপত্তা বলয়ে রূপগঞ্জ ঢাকা-৫ আসন : ডেমরায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণা সভা


এ পাতার অন্যান্য সংবাদ

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক কবিরাজি হালুয়া খেয়ে মৃত্যু! বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ছিল প্রজাতন্ত্রের দৃঢ় ভিত্তি ভয়ের সংস্কৃতিতে আড়ষ্ট সমাজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কাছে দেশবাসীর ৩টি চাওয়া সুষ্ঠু নির্বাচনে দেশ কি সক্ষম? ২৯ সেপ্টেম্বর কি হবে? পুরুষত্বের পাঠ্যবই : ছাগলের রাজত্ব, ওড়নার শ্রেষ্ঠত্ব ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মহীনতা নয় বিএনপি-জামায়াত, আওয়ামী-হেফাজত? পরিবহন খাত নৈরাজ্যমুক্ত করুন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি অবহেলার মুখে অর্থনীতি অবহেলিত অর্থনীতিবিদ নারী, তোমার সঙ্গে আড়ি! সঙ্কটের মুখেও গ্যাস রফতানির সিদ্ধান্ত কেন

অসুবিধাটা যেখানে

ঊপ-সম্পাদকীয়, সকল শিরোনাম, সর্বশেষ সংবাদ | ২৭ পৌষ ১৪২৩ | Tuesday, January 10, 2017

---আবদুল মতিন খান 
গণতন্ত্রের জন্য চিৎকার শুরু হয় দু’এক শতাব্দী আগে। ব্রিটেনে পার্লামেন্ট বহুকাল আগে থেকে ছিল। আখড়াটা ছিল ব্যারনদের। ব্যারন বা ভূস্বামীদের রাজার সঙ্গে বিরোধটা বাধে খাজনা দেয়া নিয়ে। রাজা হলেন সার্বভৌম। তার ওপরে কারও কথা চলে না। প্রজার কাছ থেকে তিনি খাজনা আদায় করবেন তার মর্জিমতো। এতে বাধ সাধলেন ভূস্বামীরা। তারা বললেন প্রজারা থাকে তাদের অধীন। কর বা খাজনা কতটা তাদের কাছ থেকে আদায় করে রাজকোষে জমা দিতে তারা পারবেন সেটা আর কেউ ভালো জানেন না। অতএব, কর আদায় ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যারনদের সভা পার্লামেন্টের অনুমোদন লাগবে। এ নিয়ে তখনকার রাজা জনের সঙ্গে ব্যারন বা জমিদারদের জোর জবরদস্তি করে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি রাজা জন স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন রানি মিড নামক স্থানে জুন ১৫, ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে। চুক্তিটি ইতিহাসে ম্যাগনাকার্টা বা ব্যক্তি স্বাধীনতার দলিল নামে খ্যাত। ম্যাগনাকার্টা দিয়ে যে আন্দোলনের শুরু সে আন্দোলন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আজও চলমান। চলছে এই বাংলাদেশেও। জবরদস্তি ছাড়া ব্যক্তি স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। প্রভু তার আধিপত্য মিষ্ট আলাপচারিতায় কখনো ছাড়েন না। ব্রিটেনে ১২১৫ সালে ব্যক্তি স্বাধীনতার দলিলটি রাজাকে দিয়ে জোর করে স্বাক্ষর করানোর পর জোর করে আরও বহু অধিকার আদায়ের শেষে ব্রিটেনের পার্লামেন্ট বর্তমানে হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতার সর্বোচ্চ প্রতীক। এই পার্লামেন্ট বা সংসদ, বলা হয়, নারীকে পুরুষ এবং পুরুষকে নারী করা ছাড়া সব পারে। মহৎ চিন্তা সংক্রামক। ব্রিটেনের দেখাদেখি পৃথিবীর সব প্রান্তে ব্যক্তি স্বাধীনতা ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত সংসদ প্রতিষ্ঠা সাধারণ দাবি হয়ে ওঠে। 
বাংলাদেশের মানুষ, দীর্ঘ দুইশ বছর ব্রিটিশ শাসনে অতিবাহিত করায়, সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। তারা একই সঙ্গে পরিচিত স্থানীয় সরকার গুলোর নির্বাচন দ্বারা গঠিত সংস্থাগুলোর সঙ্গে। ফলে জাতীয় কিংবা স্থানীয় কোনো নির্বাচন এলে ভোটাররা চঞ্চল হয়ে ওঠেন। ফেস্টুন প্ল্যাকার্ড ব্যানার প্রভৃতির সঙ্গে নানা ভোট প্রার্থীর দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা একটা জমজমাট আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে। মানুষের একঘেয়ে জীবনে নির্বাচন যে একটি মধুর ছেদ টানে তাতে সন্দেহ নেই। জনগণের সম্মতিভিত্তিক স্বশাসন ব্যবস্থার প্রতি শাসক ইংরেজ কেন এ দেশবাসীকে প্রলুুব্ধ করে তুলল সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। ইংরেজ হিন্দুস্তানে আসে ষোড়শ শতকে। অষ্টাদশ শতকে পেঁৗছে ভারতীয়দের চরিত্র সম্পর্কে তার জ্ঞান পরিপক্ব হয়। বাণিজ্যের আড়ালে সে তখনকার সমৃদ্ধতম দেশ ভারত দখলের কর্মসূচি গ্রহণ করে। মাদ্রাজ, বোম্বে ও ক্যালকাটায় সে দুর্গ নির্মাণ করে এবং প্রশিক্ষিত সৈন্য দিয়ে সেগুলো ভরে ফেলে। ইংরেজ লক্ষ্য করে যে, এ দেশ থেকে কামান বন্দুকের খোরাক সাধারণ সৈন্য সংগ্রহ করা খুব সহজ। স্থানীয় শাসকরা তাদের সৈন্যদলের সাধারণ সৈনিককে নিয়মিত বেতন দিত না। তাদের পদোন্নতির কোনো ঠিক ঠিকানা ছিল না। কেউ পেতো কেউ পেতো না। ইংরেজ তাদের বাহিনীতে যেসব ভারতীয় নিতো তাদের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দেয়া হতো প্যারেড করানো দিয়ে শুরু করে যুদ্ধাস্ত্র, বিশেষত আগ্নেয়াস্ত্র চালানো শেখানো হতো। তাদের বেতনের স্কেল ছিল, প্রারম্ভিক দিয়ে শুরু করে বছর বছর ইনক্রিমেন্ট দেয়া হতো। প্রমোশনের পর তাদের বেতন স্কেল বাড়তো। অবসর গ্রহণের পর তারা পেতেন আমৃত্যু পেনশন। ভারতীয় রাজন্যদের বাহিনীতে এসব না থাকায় সাধারণ ভারতীয় ব্রিটিশ বাহিনীতে ঢুকতে আগ্রহী থাকতো। ইংরেজ ভারতীয় সেপাইদের প্রতি এ আচরণ করত কোনো উন্নতবোধ থেকে নয়, তার স্বার্থ সংরক্ষণ ও এগিয়ে নিতে। ইংরেজের এ চাতুরি ভারতীয় সেপাই একবার ধরে ফেলে ১৮৫৭ সালে। তারা বিদ্রোহ করে। সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে এ অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। ভারতীয় সৈনিকদের দ্বিতীয় বিদ্রোহের ঘটনাটি ঘটে ১৯৪৬ সালে। ইংরেজ সেটা চাপা দিতে পারে ভারতীয় নেতাদের সহায়তায়। প-িত নেহরু ভারতীয় সৈনিকদের আশ্বস্ত করেন এই বলে যে শিগগিরই স্বাধীনতা আসছে অতএব রক্তারক্তির দরকার নেই। 

ইংরেজ ভারতীয়দের হাতে কচুকাটা হলো না। হলো ভারতীয়রা ভারতীয়দের হাতে (আজও উপমহাদেশের সর্বত্র এটা হচ্ছে) এর রহস্যটা কোথায়? রহস্যটা হলো নেহরুর মতো ইংরেজ ও তার সংস্কৃতির প্রতি অনুরক্ত ও আসক্তদের কারণে। ইংরেজ চরমপথে ভারতীয়দের ঘৃণা করে বলে ভারতে তারা বসতি গড়ে না। ইংরেজ বসতি গড়েছে আফ্রিকার সর্ব দক্ষিণের শীতপ্রধান অঞ্চলে, কানাডায়, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডে। ইংরেজ ভারতে আসে শোষণ করতে। এ কুকর্ম করতে গিয়ে তারা ভারতীয় সৈনিকদের প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। ভারতের জনগণও যাতে তাদের প্রতি ক্ষেপে না যায় তার জন্য তারা ভারতবাসীর মনে প্রতিনিধিত্বশীল দায়বদ্ধ সরকারের ধারণা ফেরি করে। তারা ইন্ডিয়া অ্যাক্ট (১৭৭৩) দিয়ে শুরু করে ইনডিপেন্ডেন্স অ্যাক্ট (১৯৪৭) দিয়ে ভারত শাসন শেষ করে। 
রেসপনসেবল গভর্মেন্টের মুলা ঝুলিয়ে তারা দু’শ বছর শোষণ করে। ইংরেজ বিদায় হলেও (১৯৪৭) তার প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা উপমহাদেশের কারও শেষ হয়নি। বিলেত যেতে পারা রয়ে গেছে তাদের সারাজীবনের স্বপ্ন। ব্রিটিশ ভিসা পাওয়া তাদের কাছে স্বর্গের ছাড়পত্রের চেয়েও বড় আকাঙ্ক্ষা পূরণ। 
এরই পৃষ্ঠপটে ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া সংসদীয় গণতন্ত্র ব্রিটিশের তৈরি এ দেশের ইংরেজি শিক্ষিত মিডল ক্লাসের সর্বাধিক প্রিয় শাসন ব্যবস্থা না হয়ে যায় না। এর অনুপস্থিতি তাদের কাছে চরম হতাশা ও অস্বস্তির কারণ হয়। ইংরেজের ভারতবর্ষ ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে এ দেশবাসীর প্রতি তার সর্বশেষ লাথিটি ছিল ধর্মের ভিত্তিতে পরিচালিত তার দীর্ঘ রাজনীতির ধর্মে বিশ্বাসী লোকদের তাদের এলাকায় তাদের গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভাগ করে যাওয়া। তার ফলে সৃষ্টি হয় ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান। ব্রিটিশ রাজত্বে হিন্দুরা ইংরেজি বিদ্যায় এগিয়ে থাকায় স্বাধীনতার পর তারা ইংরেজের রেখে যাওয়া ইন্ডিয়া অ্যাক্ট অব ১৯৩৫-এর রদবদল ঘটিয়ে স্বাধীন ভারতের উপযোগী একটি সংবিধান তৈরি করে। তার ভিত্তিতেই ইন্ডিয়া আজ শাসিত হচ্ছে। মুসলমানদের জন্য সৃষ্ট পাকিস্তানে প্রাধান্য ছিল ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচ্চ শিক্ষিত আমলা ও ভূস্বামীদের। তাদের প্রতিনিধিত্বশীল ও দায়িত্বশীল সরকারের প্রতি অনুরাগ আসক্তি কোনোটাই ছিল না। তারা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন পছন্দ করত। স্বাধীনতার পর তারা ওই শাসনই পাকিস্তানে জারি রাখে।
পূর্বপাকিস্তানের রাজনীতিবিদ ও মানুষ ব্রিটিশের তৈরি সংসদ ও স্থানীয় সরকারগুলো নির্বাচনের দ্বারা গঠন করে পরিচালনায় অভ্যস্ত হয়। ১৯৪৭ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে নির্বাচিত সংসদ ছিল এবং ওই সংসদের নেতা শপথ নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করে সরকার পরিচালনা করতেন। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ পাকিস্তান হয়ে গেলে ওই সরকার সংসদসহ ঢাকায় চলে আসে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের স্রষ্টা মি. জিন্নাহর জন্মস্থান করাচি শহর। তাকে সম্মান দেখিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজধানী করাচি ঘোষিত হওয়ায় সেখান থেকে দেশ পরিচালিত হতে থাকে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় (প্রকৃত) বাঙালি ছিল না। বাঙালি ছিল না আমলাদের মধ্যেও। পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা বাঙালি নিয়ে গঠিত থাকলেও তাদের কোমরের জোর ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের আমলাতন্ত্রের উচ্চধাপেও বাঙালি ছিল না। সেখানে প্রাধান্য ও দাপট ছিল ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা উর্দুভাষী আমলাদের। এরা কেউই বাঙালিকে মানুষ বলে ভাবত না এবং তাদের সঙ্গে আচরণও করত তদ্রূপ। এ কারণে তারা তাদের জবান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা করল। বাঙালি এর প্রতিবাদ করে দাবি করল তারা পাকিস্তানে গরিষ্ঠ হওয়ায় এবং বাংলা একটি শ্রেষ্ঠভাষা বলে বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। তখন মি. জিন্নাহ জীবিত এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি। তিনি ঢাকায় এসে রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় ও কার্জন হলের ছাত্রসভায় জোর দিয়ে ঘোষণা করলেন উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। এর তীব্র প্রতিবাদ হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিছিলের ওপর উর্দুভাষী অফিসারদের আদেশে গুলি চালানো হলো (২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২)। এই হত্যাকা-ে সারাদেশে ভাষার সম্মান রক্ষার্থে তীব্র গণআন্দোলন শুরু হয়ে গেল। তাতে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে পাকিস্তান অনুগত মুসলিম লীগ সরকারের হলো ভরাডুবি। বাংলাকে শেষ পর্যন্ত পাকিরা পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা রূপে (১৯৫৬) স্বীকার করে নিল। 
বহু টালবাহানার পর পাকিস্তানে একটি ফেডারাল কাঠামোর শাসনতন্ত্রও প্রণীত হলো। তার অধীনে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠানের অধীর প্রতীক্ষায় যখন বাংলাদেশের মানুষ তখন পাকিস্তানের সামারিক আমলারা দেশে তথাকথিত জরুরি অবস্থা জারি করে চালু করল সেপাইদের সামরিক শাসন। উদ্দেশ্য বাঙালিকে ক্ষমতায় আসতে না দেয়া।
এ শাসন অবসানের জন্য শুরু হওয়া (১৯৬১) আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে অচিরে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত (১৯৭১) হলো। এর মহানায়ক হলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বললেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, বললেন, ‘যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়।’ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বঙ্গবন্ধুকে পাকিরা ২৫ মার্চের (১৯৭১) রাতে তার বাড়ি থেকে ধরে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। তারপর শুরু হয় তাদের ৯ মাসব্যাপী খুন, অগি্নসংযোগ, নারী নির্যাতন ও লুটপাটের সন্ত্রাস। পরে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে যে সেপাই ধরে নিয়ে যেতে এসেছিল সে তার গালে চড় মারে। কী সীমাহীন বর্বরতা। 
রক্তাক্ত যুদ্ধে জয়ী হয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বাঙালি স্বাধীনতার স্বাদ পেল। অস্ট্রিক-ডেভিড এই জনতা চিরকাল ছিল পরপদানত। তার দাসত্বকে স্থায়িত্ব দিতে রাজা বল্লাল সেন বিদেশ থেকে (কর্নাটক থেকে) ব্রাহ্মণ বৈদ্য কায়স্থ প্রভৃতি উচ্চবর্ণের মানুষ এনে বাংলায় প্রবর্তন করেন কৌলিন্য প্রথা। কুলীনদের চিরস্থায়ী ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যের বস্তুতে পরিণত হলো বাঙালি ভূমিপুত্র। এই অসম্মান থেকে পরিত্রাণ পেতে তারা দলে দলে সাম্যের ধর্ম ইসলামে দীক্ষিত হলো। হয়েও যে তারা উচ্চবর্ণের ও তথাকথিত অভিজাতদের তাচ্ছিল্য ও রোষ থেকে রক্ষা পেল না তার প্রমাণ স্বধর্মী শাসকদের দ্বারা নিরন্তর উৎপীড়িত হওয়া। যার জন্য তাদের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করে জয়ী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকল না।
বাঙালি যে কোনোকালে স্বাধীন ছিল না তার সরল কারণ তাদের মধ্যে সর্বদা প্রতি যুগে কয়েকজন প্রভাবশালী বিশ্বাসঘাতকদের অবস্থান। এরা পুরো দেশবাসীর মূল্যে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থতার জন্য দেশের স্বার্থ ও স্বাধীনতা বিসর্জন দেয়। পাকিস্তান আমলে পাক দস্যু ও ঘাতকরা এদেশে আলবদর আল শামস প্রভৃতি খুনি ও স্বজাতিদ্রোহীদের তৈরি করে। এদের কাজ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী মুক্তবুদ্ধির বুদ্ধিজীবী হত্যা। এ কাজটি তারা কেবল শেষের দিনগুলোতে নয় পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময়ব্যাপী করতে থাকে। বিজয় আসন্ন হয়ে এলে এদের বড় চাঁইগুলো বিলেত, আমেরিকা ও কানাডা এবং পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। রাজাকার নামের এই বিশ্বাসঘাতকরা না জন্মালে পাকিরা বাংলাদেশে একপক্ষকালও টিকতে পারতো না। 
তাদের বৈশ্বিক স্ট্রাটেজির অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশ আন্দোলন সমর্থন করত না যদিও আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব কাগমারী সম্মেলন (১৯৫৬) থেকে ঘোষণা দিয়ে ছিল মার্কিনপন্থি। যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ হয়ে গেলে তারা বাংলাদেশকে ফের ধর্মান্ধ রাষ্ট্র পাকিস্তানপন্থি করতে চায়। বঙ্গবন্ধু তার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না এই বিশ্বাসে যে কোনো বাঙালি তাকে হত্যা করবে না। তার এ বিশ্বাস শতভাগ সত্য ছিল। তবু তিনি একদল বাঙালি দ্বারা সপরিবার ও সআত্মীয় খুন হলেন (আগস্ট ১৫, ১৯৭৫)। বিষয়টা গোলমেলে মনে হতে পারে। যারা তার খুনী তারা জন্মসূত্রে বাঙালি হলেও চেতনায় ছিল পাকিস্তানি। তাদের মদদদাতা ছিল বাংলাদেশবিরোধী পরামশক্তি যুক্তরাষ্ট্র। বাঙালি কেউ তাকে হত্যা করেনি। 
পাকিস্তানি চেতনার বাঙালিদের দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘৭৫-পরবর্তীকালে প্রায় দু’দশক বাংলাদেশ শাসন করায়। এদের একজন ছিলেন ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ ছদ্মবেশী মুক্তিযোদ্ধা মেজর জিয়া। অন্যজন জেনারেল এরশাদ। তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে এক প্রজন্ম পাকিস্তানি চেতনার শিক্ষিত ও বিত্তবান মধ্যশ্রেণি তৈরি করে। তাদের সহায়তায় আইউব মডেলের তৃণমূল পর্যন্ত রাজনৈতিক দল গঠন করায়। এই দলগুলোই এখন ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য’ সকাল-সন্ধ্যা তাদের সুহৃদ টিভি চ্যানেলগুলোর সহায়তায় ‘সংগ্রাম করছে’। 
এদেরকে বিরোধী দলের মর্যাদা দিয়ে রাজনীতি করতে দিলে দ্বিদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসবে বলে ভাবা হচ্ছে। দ্বিদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র সম্ভব হতে পারে যদি উভয় দলই দেশপ্রেমিক ও বাংলাদেশপন্থি হয়। বাংলাদেশ চেতনার (সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর) বিপরীত মতবাদে বিশ্বাসীদের নিয়ে তো দ্বিদলীয় (ব্রিটিশ মডেলের) সংসদীয় গণতন্ত্র হয় না। অথচ তাদের বিরোধী দলের মর্যাদা দেয়া হচ্ছে এবং আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। অসুবিধাটা তো সেখানে। ‘সত্যি বিচিত্র এই দেশ সেল্যুকাস!’

(০১.০১.২০১৭)

আবদুল মতিন খান: রাষ্ট্রনীতি ও সমাজ বিকাশ বিষয়ে সন্ধিৎসু